টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই স্বপ্ন স্বপ্ন-ই থেকে গেল, সত্যি হল না। ভবানীপুরে ঘরের মেয়েকেই হারিয়ে দিল সেখানকার ভোটাররা। মমতা হারলেন সেই শুভেন্দু অধিকারির কাছে। পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর কাছেই হেরেছিলেন মমতা। এ বারেও ভোটের আগে শুভেন্দু জোরের সঙ্গে বলেছিলেন– ভবানীপুরেও উনি হারবেন। আর সেটাই হল। সেইসঙ্গে তৃণমূল ২২৬টিরও বেশি আসন পাবে, রেকর্ড গড়বে বলে মমতা যা বলেছিলেন, তা-ও মিলল না। কার্যত গেরুয়া ঝড়ে উড়ে গেল ঘাসফুল। এ ভাবেই ২৬-এর ভোটে বঙ্গে ফের বদলের ইতিহাস তৈরি করল বিজেপি। এ নিয়ে মমতার সাফাই–‘‘এটা কী ধরনের জয়! এটা ইমমোরাল ভিক্ট্রি। মোরাল ভিক্ট্রি নয়। পুরোটাই বেআইনি। জোর করে জিতেছে। লুট, লুট, লুট। আমরা ঘুরে দাঁড়াবই।’’
কিন্তু প্রশ্ন– এতদিন যে হিন্দু ভোট একজোট হচ্ছিল না, সেটাই কি বিজেপির বঙ্গ-বিজয়ের প্রধান কারণ? অনেকে-ই সে রকম মনে করলেও সেই তত্ত্বে বিশ্বাসী নন অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার প্রদীপ গুপ্তা। বরং তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন– অনেকেই যা ভাবছেন, অর্থাৎ শুধুমাত্র হিন্দু ভোটের মেরুকরণের কারণে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি জিতেছে, তা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বরং তৃণমূলের দীর্ঘ বছরের ‘অপশাসন’, রাজ্যে তৈরি হওয়া ‘ভয়ের পরিবেশ’, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং অমিত শাহ ও আরএসএসের নিখুঁত সাংগঠনিক দক্ষতাই বিজেপিকে বাংলায় ক্ষমতায় এনেছে।
সংবাদসংস্থা পিটিআইয়ের সাক্ষাৎকারে প্রদীপ দাবি করেছেন–ধর্মীয় মেরুকরণ নয়, বরং সুশাসনের ওপর ভর করেই বিজেপি একের পর এক রাজ্যে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে সফল হচ্ছে। বাংলার মানুষও ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে সুশাসন পেতে চেয়েছেন। এমনটি যে ঘটতে পারে তা বিন্দুমাত্র বুঝতে পারেনি তৃণমূল নেতৃত্ব। বরং মমতা ধরেই নিয়েছিলেন যে, বিজেপিকে কোনওভাবেই বঙ্গবাসী তৃণমূলের বিকল্প ভেবে ভোট দেবে না। তাই দলের সুপ্রিমো থেকে সেকেন্ড ইন কম্যান্ড– ভোটের প্রচারে তাঁদের মুখে অহমিকা-ই প্রকাশ পেয়েছে। তার-ই পরিণতি ভোটারদের চরম নীরবতা। মানুষ যে তৃণমূলের থেকে মুখ ফিরিয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, তা তাঁদের নীরবতার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে অনেকেই মনে করছেন।
তা হলে শুধুমাত্র ধর্মীয় মেরুকরণের ফলে-ই কি বঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদল! নাকি এই চর্চার মধ্যে যে অঙ্কটি লুকিয়ে আছে তা হল, ‘ক্রশ ভোটিং’। বাম থেকে অবাম– ভোটের বড় অংশ গেরুয়া শিবিরের জয়কে ত্বরান্বিত করেছে! কারণ, ১৫ বছরের তৃণমূলের শাসনে এ রাজ্যে বিরোধীরা কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। একের পর এক পার্টি অফিস দখল থেকে বিরোধীশূন্য রাজনীতির যে খেলা শুরু হয়েছিল, তা থেকে পরিত্রাণ পেতে বিরোধীরা পদ্মাসনে বাংলাকে বসাতে চেয়েছে। যাতে ঘাসফুলকে সরিয়ে পদ্মজমানায় বিরোধীরা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। শুরুতেই গেরুয়া শিবির জানিয়ে দিয়েছে যে, পালাবদল হলেও তারা তৃণমূলের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে না। যা বিরোধীদের অক্সিজেন জোগাচ্ছে। কিন্তু ঘাসফুলকে কতটা অক্সিজেন দেবে, তা ভবিষ্যৎ বলবে।
তবে অক্সিজেন পেয়ে এর মধ্যেই সিপিআইএমের শ্রমিক সংগঠনের নেতারা হকার উচ্ছেদ এবং অন্যান্য দাবি-দাওয়া নিয়ে গলা ফাটাতে শুরু করেছেন। সিটুর পতাকা নিয়ে তাঁদের রাস্তা অবরোধ করতেও দেখা যাচ্ছে। দলের দুঃসময়ে কোনও কোনও তৃণমূল নেতা স্বমহিমায় ফিরতে চাইছেন। কিন্তু কংগ্রেসকে এখনও কোনও ইস্যুতে শাসকদলের বিরুদ্ধে সরব হতে দেখা না গেলেও বিরোধীরা যাতে মাথা তুলতে না পারে, তা আগেভাগে-ই বুঝেছিলেন বামফ্রন্ট শাসনের অবসানের শুরুতেই তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই তাঁর লক্ষ্য ছিল বিরোধীশূন্য বাংলা। তাতে তিনি সফল হলেও চতুর্থবার বাংলার মসনদে বসতে পারলেন না। গোটা রাজ্য তাঁর দলের মহাপতনের-ই ছবি দেখল। ঘটে গেল এক নিঃশব্দ বিপ্লব!
ছবি– সংগৃহীত।
Post Views: 1,007