25.9 C
Kolkata
Sunday, November 8, 2026
Home রাজ‍্য দক্ষিণবঙ্গ রামের অযোধ্যা থেকে কালীমায়ের বাংলা: আলোর উৎসবে বৈচিত্র্যের ভারত

রামের অযোধ্যা থেকে কালীমায়ের বাংলা: আলোর উৎসবে বৈচিত্র্যের ভারত

নৈহাটির ‘বড় মা’। ছবি– সংগৃহীত।

ডিজিটাল ডেস্ক, ৮ নভেম্বর: দেশজুড়ে দীপাবলির উদযাপনে এ বছরও ধরা পড়ল বৈচিত্র্যের অনন্য ছবি। উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় ৩৬ লক্ষেরও বেশি প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়েছে সরযূর তীর, অন্যদিকে বাংলাজুড়ে কালীপুজোর আরাধনায় মেতেছেন লক্ষ লক্ষ ভক্ত। একই উৎসবপর্ব হলেও দুই অঞ্চলের উদযাপনের ধরন, ধর্মীয় অনুষঙ্গ এবং সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গি ছিল ভিন্ন।

অযোধ্যায় দীপোৎসবকে ঘিরে ছিল নজিরবিহীন উৎসাহ। রামচন্দ্রের বনবাস শেষে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের স্মৃতিতে আয়োজিত এই উৎসবে সরযূ নদীর ঘাটজুড়ে এ বার সাজানো হয় ৩৬ লক্ষেরও বেশি মাটির প্রদীপ। আলোয় সেজে ওঠা শহরকে ঘিরে আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচি। দেশ-বিদেশ থেকে আগত পর্যটকদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে গোটা শহর।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অযোধ্যার দীপোৎসব কেবল ধর্মীয় উৎসবের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। পর্যটন, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য প্রচারের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রশাসনের দাবি, এই আয়োজনের ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্প নতুন গতি পেয়েছে।

অন্যদিকে বাংলায় দীপাবলির রাত মানেই কালীপুজো। শক্তির দেবী কালীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের শহর ও গ্রামে সাজানো হয় অসংখ্য পুজোমণ্ডপ। রাতভর চলবে পুজো, আরতি, পুষ্পাঞ্জলি এবং ধর্মীয় আচার। তাই কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া থেকে উত্তরবঙ্গ, সর্বত্রই রবিবার সকাল থেকেই ছিল ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ভিড়।

বিশেষ করে উত্তর ২৪ পরগনার নৈহাটিতে কালীপুজোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘বড় মা’। শতাব্দীপ্রাচীন এই পুজোকে ঘিরে প্রতি বছর বিপুল জনসমাগম হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস ও আবেগের কেন্দ্রে থাকা ‘বড় মা’-র দর্শনের জন্য দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা নৈহাটিতে আসেন। কালীপুজোর রাতে নৈহাটির জনসমুদ্র প্রমাণ করে, বাংলার শাক্ত ঐতিহ্য এখনও মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একইসঙ্গে উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে থিমভিত্তিক কালীপুজোগুলিও বিপুল দর্শনার্থীর ভিড় টেনেছে। অভিনব মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা ও সামাজিক বার্তাভিত্তিক উপস্থাপনার কারণে বারাসাতের একাধিক পুজোমণ্ডপে শনিবার রাত থেকেই দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। একদিকে নৈহাটির ‘বড় মা’-কে ঘিরে লোকবিশ্বাস ও ঐতিহ্যের আকর্ষণ, অন্যদিকে বারাসাতের থিম-পুজোর আধুনিক শিল্পভাবনা। এই দুই প্রবণতাই দেখায়, বাংলা একই সঙ্গে তার ঐতিহ্যকে ধারণ করছে এবং নতুন সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গিকেও আপন করে নিচ্ছে।

                              অযোধ্যায় ‘দীপোৎসব’। ছবি– সংগৃহীত।

সংস্কৃতি বিশ্লেষকদের মতে, অযোধ্যার দীপোৎসব এবং বাংলার কালীপুজো ভারতের দুই পৃথক সাংস্কৃতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। অযোধ্যার উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু রামায়ণের স্মৃতি ও আলোর সমারোহ, আর বাংলার কালীপুজোর মূল সুর শক্তির উপাসনা, ভক্তি এবং লোকঐতিহ্য। একটিতে রয়েছে দৃশ্যমান মহিমা, অন্যটিতে রয়েছে ধর্মীয় অনুভূতি ও সামাজিক সংযোগের গভীরতা।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও দুই উৎসবের প্রভাব লক্ষণীয়। অযোধ্যায় হোটেল, পরিবহণ ও পর্যটন-নির্ভর ব্যবসায় বাড়তি গতি এসেছে। একইভাবে বাংলায় কালীপুজোকে কেন্দ্র করে প্রতিমাশিল্পী, আলোকসজ্জা শিল্প, ফুল ব্যবসায়ী, মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা বেড়েছে। উৎসব ঘিরে তৈরি হয়েছে উল্লেখযোগ্য আর্থিক কর্মকাণ্ড। তবে আয়োজনের ধরন ভিন্ন হলেও দুই উৎসবের অন্তর্নিহিত বার্তা এক। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে অগ্রসর হওয়া, অশুভর ওপর শুভশক্তির জয়ের বিশ্বাস এবং মানুষের মধ্যে আস্থা ও আশার সঞ্চার। রামের অযোধ্যা থেকে কালীমায়ের বাংলা, এই দুই উৎসব-পরম্পরা সেই বার্তাকেই ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক ভাষায় প্রকাশ করে।

ভারতের বহুত্ববাদী চরিত্রের অন্যতম শক্তি এটাই যে, একই উৎসবকে বিভিন্ন অঞ্চল নিজেদের ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের আলোকে নতুন অর্থ দেয়। অযোধ্যার দীপসাগর এবং বাংলার কালীপুজো তাই কেবল  উৎসব নয়; তারা ভারতের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের দুটি উজ্জ্বল প্রতীক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here