25.9 C
Kolkata
Sunday, November 8, 2026
Home সম্পাদকীয় উত্তর সম্পাদকীয় হিমালয়ের ভঙ্গুর ভূগোলে উন্নয়নের চাপ: ঝুঁকি মোকাবিলায় ভারতের করণীয় কী?

হিমালয়ের ভঙ্গুর ভূগোলে উন্নয়নের চাপ: ঝুঁকি মোকাবিলায় ভারতের করণীয় কী?

হিমালয়। আদি কৈলাসের পথে ছবিটি তুলেছেন– অর্পিতা সাহা।

হিমালয়ের সংবেদনশীল অঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে পরিকাঠামো ও জনবসতি। ঝুঁকি মোকাবিলায় ভারতের বিভিন্ন উদ্যোগ শুরু হলেও উন্নয়ন এবং নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ।

লিখছেন – অনিমেষ বসু সরকার

হিমালয় অঞ্চলে উন্নয়ন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সড়ক, সেতু, পর্যটন পরিকাঠামো, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় কৌশলগত নির্মাণকাজ একদিকে যেমন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সংযোগ বৃদ্ধি করছে, অন্যদিকে এ সব কার্যক্রমের একটি অংশ এমন এলাকায় ঘটছে, যেগুলো বিভিন্ন গবেষণায় বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক ঝুঁকির প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

সম্প্রতি একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপাল, উত্তরাখণ্ড এবং দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বতের কয়েকটি বন্যা-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভবন, পরিকাঠামো ও অন্যান্য নির্মাণকাজের জন্য জমির পরিমাণ প্রায় ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষকদের মতে, এ সব অঞ্চলে প্রায় তিন লক্ষ মানুষ সম্ভাব্য বন্যা-ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন।

তবে এই পরিস্থিতিকে কেবল পরিবেশগত সংকট হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। পার্বত্য অঞ্চলে উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, সীমান্ত পরিকাঠামো এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। ফলে গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় সরকার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ও দুর্যোগ প্রস্তুতির জন্য একাধিক পদক্ষেপ করেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি হল, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তৈরি করা হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নির্দেশিকা। ২০২০ সালে প্রকাশিত এই নির্দেশিকায় হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।  এ ছাড়া ভারত সরকার জাতীয় হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা ঝুঁকি প্রশমন কর্মসূচির আওতায় হিমালয়ের বিভিন্ন রাজ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদগুলোর সরেজমিন পরিদর্শন ও প্রশমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ শুরু করেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলে প্রায় ৭,৫০০ হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৮৯টিকে উচ্চ-ঝুঁকির বলে চিহ্নিত করে সরেজমিন মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।  একই সঙ্গে জাতীয় দূর অনুধাবন কেন্দ্র এবং কেন্দ্রীয় জল কমিশন উপগ্রহচিত্রের মাধ্যমে হিমবাহ-হ্রদ পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে   ২০২৩ সালে সিকিমে দক্ষিণ লোনাক হ্রদ সম্পর্কিত বিপর্যয়ের পর কেন্দ্রীয় সরকার ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজ আরও জোরদার করেছে। কেন্দ্রীয় জল কমিশনের তথ্য অনুযায়ী হিমবাহ-হ্রদজনিত বন্যার ঝুঁকিতে থাকা বাঁধগুলোর নকশা পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন বাঁধ প্রকল্পের ক্ষেত্রে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা সংক্রান্ত সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

উত্তরাখণ্ডেও সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ-ঝুঁকির হ্রদগুলোতে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার জন্য কাজ শুরু হয়েছে। সূত্র বলছে– বসুন্ধরা তাল-সহ কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদে সেন্সর, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি স্থাপন করা হচ্ছে, যাতে সম্ভাব্য বিপদের আগাম সংকেত পাওয়া যায়।

তবে প্রশ্ন রয়ে যায়, এ সব পদক্ষেপ কি যথেষ্ট?

কারণ, হিমালয়ের ঝুঁকি শুধু একটি রাজ্য বা একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নদী, হিমবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আন্তঃসীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি তথ্য বিনিময়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে যে, দুর্যোগ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার চেয়ে দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি অনেক বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, ভূমি-ব্যবহারের সুস্পষ্ট নীতি, নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া কেবল পরিকাঠামোগত বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে।

সাম্প্রতিক গবেষণা এবং সরকারি উদ্যোগগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করছে: উন্নয়ন থামানো নয়, বরং উন্নয়নকে ঝুঁকি-সংবেদনশীল করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। হিমালয়ে সড়ক, বিদ্যুৎ বা পর্যটন পরিকাঠামো নির্মাণ প্রয়োজন হতেই পারে, কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি বৈজ্ঞানিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে না হয়, তা হলে তার দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

হিমালয়ের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি উন্নয়ন না পরিবেশ, এমন কোনো দ্বন্দ্ব নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হল, উন্নয়ন কতটা ঝুঁকি-সচেতন এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণা ও সরকারি উদ্যোগ দু’টিই ইঙ্গিত করছে যে, আগামী দশকে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পরিকাঠামো তৈরির গতি এবং দুর্যোগ-সহনশীলতার সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। উন্নয়নের সাফল্য শেষ পর্যন্ত কত কিলোমিটার সড়ক নির্মিত হল বা কতগুলো প্রকল্প বাস্তবায়িত হল, তা দিয়ে নয়; বরং সেই উন্নয়ন কতটা নিরাপদ, টেকসই ও ভবিষ্যৎ-সহনশীল, সেটিই হবে প্রকৃত মানদণ্ড।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here