জীবন তাঁকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। তাই তাঁকে আজ ‘চোর’ বদনাম শুনতে হচ্ছে। তাঁর দিকে ধেয়ে এল জনরোষ। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিম বঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। কখনও কি স্বপ্নেও ভেবেছিলেন যে তাঁকেও একদিন জনরোষের মুখে পড়তে হবে! কখনও কি ভেবেছিলেন রাজ্যপাট হারিয়ে তিনি ক্রমশ একা হবে যাবেন! ভোটে বিপর্যয়ের পর দলের টিকিটে জয়ী বিধায়ক থেকে সাংসদরা একে একে তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। কখনও কি ভেবেছিলেন একদা যিনি নিজেকে ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ বলে জাহির করতেন, তাঁর দিকেই উড়ে আসবে কাদা, ইট, পাথর এমনকী জুতো। হায়! ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! এটি কেবল একটি বাক্য নয়, বরং মানব জীবনের এক নিষ্ঠুর সত্যের বহিঃপ্রকাশ।
জীবনের রঙ্গমঞ্চে এমন কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে, যা মানুষের সমস্ত পরিকল্পনাকে এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দেয়। রবিবার উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বীজপুরে এসে তা টের পেলেন মমতা। এ যেন সেই ‘টাইটানিক’ জাহাজের মতো। যাকে বলা হয়েছিল ‘কখনও ডুববে না’, সেটিই তার প্রথম যাত্রায় এক হিমশৈলের আঘাতে অতল সাগরে তলিয়ে যায়। মমতার উপর জনরোষ এমন-ই এক নিয়তির নিষ্ঠুর ভাগ্যের পরিহাসেরই নামান্তর। একই দশা মমতার দোর্দণ্ডপ্রতাপ ভাইপো ও তাঁর অনুগামীদের। জনরোষ থেকে তাঁদের দিকেও উড়ে আসছে ডিম। কিল-চড়-ঘুসিও খেতে হচ্ছে। জনরোষ সামলাতে গিয়ে নিরাপত্তারক্ষীদের হিমসিম খেতে হচ্ছে। হায়! নিয়তির কী নির্মম পরিহাস!
তোলাবাজি-সহ বিভিন্ন অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচরাপাড়া পুরসভার তৃণমূলের পদত্যাগী কাউন্সিলর জেনি শর্মা কেওটের স্বামী বিরজু কেওটকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। শনিবার লকআপে তাঁর রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, পিটিয়ে মারা হয়েছে বিরজুকে। রবিবার দুপুরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা তাঁর দলের দুই সাংসদকে নিয়ে বিরজুর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বীজপুরে তাঁরা জনরোষের মুখে পড়েন।
মমতার অভিযোগ–গাড়ির জানালা খোলা থাকলে ইটের ঘায়ে তাঁদের মাথা ফাটত। তাঁরা মারা যেতেন। এ জন্য জন্য নাম না করে তিনি রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারিকে-ই নিশানা করেছেন। আর মুখ্যমন্ত্রীর কটাক্ষ, ‘‘এত চুরি করেছেন, চোর তো শুনতেই হবে। কানে হেডফোন ব্যবহার করুন। তা হলে চোর শুনতে পাবেন না।’’ সেইসঙ্গে শুভেন্দুর সংযোজন– বিজেপির পতাকাও ছিল না। বিজেপি কর্মীরাও ছিল না। এত বিপুল জনরোষ! অভয়াকে সরকারি হাসপাতালে মেরেছিলেন। প্রমাণ লোপাট করতে গিয়েছিলেন, ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে কিনতে গিয়েছিলেন। আপনার গাড়িতে কাদা মাখাবে না তো কী ফুল ছুড়বে! যদিও শুভেন্দুর মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য অগ্নিমিত্রা পলের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। মমতাকে বিক্ষোভ দেখানো প্রসঙ্গে তাঁর প্রশ্ন–হোয়াট ইজ দিস! ওঁর অনেক দোষ থাকতে পারে, তাই বলে জুতো-কাদা ছুড়বেন! মমতা অবশ্য বলেছেন– আমি বেরোবই। বিজেপি ভয় পায় আমায়। এই ভাবে আমায় আটকাতে পারবে না। ওরা ভয় পাচ্ছে কারণ ওদের মুখোশ খুলে যাবে।
আসলে ভাগ্যের পরিহাস মানুষকে যেমন কাঁদায়, তেমনি তাকে ভিতর থেকে শক্ত ও পরিপক্ক করে তোলে। এটি মানুষকে শেখায় যে, অহংকার চিরস্থায়ী নয় এবং জীবনের কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়। সব হারিয়েও মানুষ আবার উঠে দাঁড়ায়, নতুন করে স্বপ্ন দেখে। পরিহাসের এই নিষ্ঠুর আঘাতগুলোকে মেনে নিয়ে, ধৈর্যের সঙ্গে জীবনের পথে এগিয়ে যেতে যাওয়াই হল প্রকৃত মানুষের ধর্ম। এখন প্রশ্ন– সেইমতো মমতা কি উঠে দাঁড়াতে পারবেন! সময় তা বলবে।